০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাঁচ বছরেও চার্জশিট নেই: গোদাগাড়ি রফিকুল হত্যা কি আরেকটি বিচারহীনতার প্রতীক?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৩৬:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৫৯৭ বার পড়া হয়েছে

এম এস সাগর, রাজশাহী: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে হেরোইন আত্মসাতের ঘটনায় বাহক রফিকুল ইসলামকে (৩২) হত্যার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো আদালতে চার্জশিট জমা পড়েনি। তদন্তে পুলিশের পাঁচ সদস্যের নাম উঠে এলেও কেউ গ্রেফতার হয়নি। তারা এখনো স্বাভাবিক চাকরিতে আছেন—যা ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে “বিচারহীনতার নগ্ন উদাহরণ” বলে মনে হচ্ছে।

২০২০ সালের ২১ মার্চ রাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসাহাক আলীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গোদাগাড়ী থানার একটি বিশেষ টিম রফিকুল ও তার সহকারী জামালকে আটক করে। উদ্দেশ্য ছিল হেরোইন আত্মসাৎ। পরে রফিকুলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং হেরোইন নিজেদের কাছে রেখে মামলাটিকে অন্যখাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তদন্তে উঠে আসে পুলিশের পাঁচ সদস্যের নাম—এসআই মিজানুর রহমান, এসআই আবদুল মান্নান, এসআই রেজাউল ইসলাম, কনস্টেবল শাহাদাত হোসেন ও কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম।

পরদিন পদ্মার চরে রফিকুলের লাশ উদ্ধার হয়। প্রথমে ‘বজ্রপাতে মৃত্যু’ দেখিয়ে অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে মারধরের চিহ্ন পাওয়া যায়। এরপর রফিকুলের স্ত্রী রুমিসা খাতুন হত্যার মামলা দায়ের করেন, এবং তদন্তভার যায় পিবিআই রাজশাহীর হাতে।

রুমিসা খাতুন অভিযোগ করে বলেন,“যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে, তারাই তাকে মামলায় আসামি বানিয়েছে। পাঁচ বছরেও কোনো বিচার নেই। শুধু তদন্তের নামে সময় পার করা হচ্ছে।”

রফিকুলের বাবা ফজলুর রহমানের ভাষায়,
“তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়, কথা বদল হয়, কিন্তু খুনিরা বদলি হয়ে চাকরি করে। আমাদের বিচার চাওয়াই যেন অপরাধ হয়ে গেছে।”

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক উদয় কুমার মণ্ডল বলেন, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন, তাই বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না। তবে তিনি জানান, তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র ছয় মাস আগে।

অন্যদিকে, পিবিআই রাজশাহীর এসপি মনিরুল ইসলামের মন্তব্য পাওয়া যায়নি—একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি সাড়া দেননি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত ও প্রাথমিক প্রমাণ একত্রে থাকা সত্ত্বেও চার্জশিট না দেওয়া মানে ‘অভিযুক্তদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া’।

মানবাধিকার কর্মীরাও বলছেন, পুলিশ সদস্যদের নাম জড়িত থাকলে তদন্ত প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করা হয়—ফলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়।

প্রশ্ন উঠেছে—রফিকুল ইসলাম কি বাংলাদেশের আরেকটি ‘বিচারহীনতার প্রতীক’ হয়ে থাকবে? নাকি তার পরিবার একদিন দেখবে, আইনই জয়ী হয়েছে—প্রভাব নয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

পাঁচ বছরেও চার্জশিট নেই: গোদাগাড়ি রফিকুল হত্যা কি আরেকটি বিচারহীনতার প্রতীক?

আপডেট সময় : ১২:৩৬:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

এম এস সাগর, রাজশাহী: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে হেরোইন আত্মসাতের ঘটনায় বাহক রফিকুল ইসলামকে (৩২) হত্যার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো আদালতে চার্জশিট জমা পড়েনি। তদন্তে পুলিশের পাঁচ সদস্যের নাম উঠে এলেও কেউ গ্রেফতার হয়নি। তারা এখনো স্বাভাবিক চাকরিতে আছেন—যা ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে “বিচারহীনতার নগ্ন উদাহরণ” বলে মনে হচ্ছে।

২০২০ সালের ২১ মার্চ রাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসাহাক আলীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গোদাগাড়ী থানার একটি বিশেষ টিম রফিকুল ও তার সহকারী জামালকে আটক করে। উদ্দেশ্য ছিল হেরোইন আত্মসাৎ। পরে রফিকুলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং হেরোইন নিজেদের কাছে রেখে মামলাটিকে অন্যখাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তদন্তে উঠে আসে পুলিশের পাঁচ সদস্যের নাম—এসআই মিজানুর রহমান, এসআই আবদুল মান্নান, এসআই রেজাউল ইসলাম, কনস্টেবল শাহাদাত হোসেন ও কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম।

পরদিন পদ্মার চরে রফিকুলের লাশ উদ্ধার হয়। প্রথমে ‘বজ্রপাতে মৃত্যু’ দেখিয়ে অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে মারধরের চিহ্ন পাওয়া যায়। এরপর রফিকুলের স্ত্রী রুমিসা খাতুন হত্যার মামলা দায়ের করেন, এবং তদন্তভার যায় পিবিআই রাজশাহীর হাতে।

রুমিসা খাতুন অভিযোগ করে বলেন,“যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে, তারাই তাকে মামলায় আসামি বানিয়েছে। পাঁচ বছরেও কোনো বিচার নেই। শুধু তদন্তের নামে সময় পার করা হচ্ছে।”

রফিকুলের বাবা ফজলুর রহমানের ভাষায়,
“তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়, কথা বদল হয়, কিন্তু খুনিরা বদলি হয়ে চাকরি করে। আমাদের বিচার চাওয়াই যেন অপরাধ হয়ে গেছে।”

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক উদয় কুমার মণ্ডল বলেন, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন, তাই বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না। তবে তিনি জানান, তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র ছয় মাস আগে।

অন্যদিকে, পিবিআই রাজশাহীর এসপি মনিরুল ইসলামের মন্তব্য পাওয়া যায়নি—একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি সাড়া দেননি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত ও প্রাথমিক প্রমাণ একত্রে থাকা সত্ত্বেও চার্জশিট না দেওয়া মানে ‘অভিযুক্তদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া’।

মানবাধিকার কর্মীরাও বলছেন, পুলিশ সদস্যদের নাম জড়িত থাকলে তদন্ত প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করা হয়—ফলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়।

প্রশ্ন উঠেছে—রফিকুল ইসলাম কি বাংলাদেশের আরেকটি ‘বিচারহীনতার প্রতীক’ হয়ে থাকবে? নাকি তার পরিবার একদিন দেখবে, আইনই জয়ী হয়েছে—প্রভাব নয়।