নিহত ২১৩, আহত ৪৬৪ — নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে বাড়ছে সড়ক মৃত্যুর মিছিল
রংপুর অঞ্চলে ১১ মাসে ৪১০ দুর্ঘটনা
- আপডেট সময় : ০৯:১০:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৫৬৪ বার পড়া হয়েছে
রংপুর প্রতিনিধি: চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রংপুর অঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ সময়ের মধ্যে ৪১০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১৩ জন, আহত হয়েছেন অন্তত ৪৬৪ জন। আহতদের অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
দুর্ঘটনাজনিত এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত দায়ের হয়েছে ১৯০টি মামলা। একই সঙ্গে সড়ক আইন অমান্য করায় হাইওয়ে পুলিশ ১৪ হাজার ৭৫৮টি মামলা করেছে, যা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়েছে।
৩৭৩ কিলোমিটার মহাসড়কে বাড়ছে ঝুঁকি
হাইওয়ে পুলিশ রংপুর রিজিয়নের আওতায় রয়েছে তেঁতুলিয়া, বোদা, সাতমাইল, তারাগঞ্জ, বড়দরগা, গোবিন্দগঞ্জ ও হাতীবান্ধা থানা। এসব থানার নিয়ন্ত্রণে ৩৭৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক ও ১৩৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়ক রয়েছে।
প্রতিদিন এসব পথে রাজধানী ও অন্যান্য জেলায় যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সড়কের কিছু অংশের নাজুক অবস্থা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং চালকদের অসতর্কতা–অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনার হার বেড়েই চলছে।
মানবিক ট্র্যাজেডির নাম সড়ক দুর্ঘটনা
নাট্যকার ও ভাওয়াইয়া গবেষক আশরাফুজ্জামান বাবু দুই মাস আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হন। মুখে ও ঠোঁটে গভীর ক্ষত নিয়ে এখনো চিকিৎসাধীন তিনি।
গোবিন্দগঞ্জের যুবক রাশেদ দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করে হুইলচেয়ারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। রংপুরের নজিরেরহাটের আব্দুর রহিম অনিক স্ত্রী-সন্তানসহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন। ধারদেনায় চলছে চিকিৎসা ও সংসার।
তাদের মতো আরও অনেকের গল্প আড়ালে থেকে যায়। প্রতিদিন ভোরে জীবিকার টানে যারা পথে নামেন, তাদের কেউ কেউ আর ফিরে আসেন না। কেউ ফিরে আসেন ভাঙা শরীর ও শূন্য ভবিষ্যৎ নিয়ে।
হাইওয়ে পুলিশের উদ্যোগ
হাইওয়ে পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সড়কে নিয়মিত টহল, যানবাহন তল্লাশি এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, প্রচারণা এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।
রংপুর রিজিয়নের পুলিশ সুপার আবু তোরাব মো. শামছুর রহমান বলেন, “অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অদক্ষ চালকই দুর্ঘটনার মূল কারণ। আমরা নিয়মিত টহল ও সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছি। ভবিষ্যতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।”
জনগণের অভিমত
সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ নয়—চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। দক্ষ ও বিশ্রামপ্রাপ্ত চালক ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।
দেশজুড়ে সড়ক মৃত্যুর ভয়াবহতা
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত নভেম্বর মাসে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৮৩ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩১৭ জন। অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বর মাসে মৃত্যু বেড়েছে ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ।
ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী,
১৩১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে,
২৪৫টি আঞ্চলিক সড়কে, ৮২টি গ্রামীণ সড়কে, ৭১টি শহরের সড়কে এবং ৫টি অন্যান্য স্থানে।
এর মধ্যে ১২২টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৩৭টি নিয়ন্ত্রণ হারানো, ১০৯টি পথচারীকে ধাক্কা দেওয়া, ৫৯টি পিছন থেকে আঘাত করা এবং ৭টি অন্যান্য কারণে ঘটে।
দুর্ঘটনার কারণ ও করণীয়
বিশ্লেষকরা বলছেন,
ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও যানবাহন, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, বিশ্রামহীন ড্রাইভিং, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা এখন এক অনবরত জাতীয় সংকট।
তাদের মতে, সড়কে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রশাসন, চালক, পরিবহন মালিক, যাত্রী এবং সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে।














