০১:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আইন ভেঙে লাইসেন্স নবায়ন, অভিযুক্ত মোহনপুর সাব-রেজিস্ট্রার ও সমিতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৫৪:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৫৯৫ বার পড়া হয়েছে

রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় অযোগ্য, নিষ্ক্রিয় ও কার্যক্ষমতা হারানো দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার তানিয়া তাহের গত দুই বছর ধরে বিপুল অর্থের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়ন করে আসছেন। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজিআর) এবং জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহনপুর দলিল লেখক সমিতির বেশ কয়েকজন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে দলিল লেখার কাজে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা অযোগ্য। কেউ কেউ ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কোনো দলিল লেখেননি, কারও ডায়েরি নেই, আবার কেউ প্যারালাইসিস, অসুস্থ বা মাদকাসক্ত দলিল লেখায় অক্ষম অবস্থায় রয়েছেন। তবুও প্রতি বছর নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হচ্ছে।

নওনগর গ্রামের সোলায়মান কাজির ছেলে সাব-রেজিস্ট্রার হওয়ার পর নিজে আর দলিল লেখেন না, তবুও তার ৫৮ নম্বর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। সইপাড়া গ্রামের সাবেক সভাপতি আলহাজ মুনসুর রহমান (সনদ ২১), সাঁকোয়া গ্রামের মাহতাবুল আলম মুহুরি (সনদ ৩৫), তশোপাড়া গ্রামের আব্দুর রহমান (সনদ ১১), হাটরা গ্রামের রফিকুল আলম (সনদ ৪৬), বেলনা গ্রামের একরামুল হক (সনদ ২৯) এদের অধিকাংশই বহু বছর ধরে নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।
এছাড়াও রফিক ভাণ্ডারির ভাই ইকবাল হোসেন (সনদ ৪৫) সহ দলিল লেখক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের ৩/৫ জন নিয়মিত মাদক সেবন করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যারা মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত তাদের ডোপ টেস্ট করে সনদ বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছে।

অভিযোগকারী প্রশ্ন তুলেছেন, “যারা বছরের পর বছর একটি দলিলও লেখে না, অথচ দলিল লেখক সমিতি ও সাব-রেজিস্ট্রারের যোগসাজশে তাদের লাইসেন্স নবায়ন হয়, তারা কিসের দলিল লেখক?”

‘দলিল লেখক (সনদ) বিধিমালা, ২০১৪’-এর ৮(১) ধারায় বলা আছে— যাদের শারীরিক অক্ষমতা, নৈতিক স্খলন, মাদকাসক্তি বা পেশাগত নিষ্ক্রিয়তা রয়েছে, তাদের সনদ বাতিলযোগ্য। এছাড়া ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে, নিয়মিত কার্যক্রমহীন বা অসুস্থ দলিল লেখকের লাইসেন্স নবায়ন করা আইনত অপরাধ।

আইনজীবীরা বলেছেন, দলিল লেখক সনদ একটি সরকারি অনুমোদনপত্র। এটি নবায়নে দুর্নীতি হলে সম্পত্তি হস্তান্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। তারা বলেন, “দলিল লেখক লাইসেন্স নবায়নে দুর্নীতি বা ঘুষ গ্রহণ দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”

মোহনপুর উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আতাউর রহমান পিটার বলেন, অভিযোগের বিষয়টি সঠিক নয়। নিয়ম মেনেই সনদ নবায়ন করা হয়। তাছাড়া সাব-রেজিস্ট্রারের যেভাবে আমাদের নির্দেশনা দেন তার বাইরে আমাদের যাওয়ার কোন সুযোগ নাই।

মোহনপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার তানিয়া তাহের বলেন, “অভিযোগ কিছুটা সত্য। তবে তাদের রুটি-রুজির কারণেই লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। আমার কাছে তো কেউ মাদকাসক্ত হয়ে আসে না যে বুঝব কে মাদকাসক্ত। অভিযোগের সত্যতা খুঁজে দেখব। সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা দলিল লেখক সমিতি নিতে পারে, আমি নিই না।”

রাজশাহী জেলা রেজিস্ট্রার মো. আব্দুর রকিব সিদ্দিক বলেন, “এসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। অভিযোগ পেলে গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখব।”

অভিযোগকারীরা বলেছেন, “এই অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক নয়, আইনি অপরাধও বটে। তাই বিষয়টি নিবন্ধন অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত করে অবৈধ নবায়নে জড়িত সাব-রেজিস্ট্রার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

আইন ভেঙে লাইসেন্স নবায়ন, অভিযুক্ত মোহনপুর সাব-রেজিস্ট্রার ও সমিতি

আপডেট সময় : ১১:৫৪:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় অযোগ্য, নিষ্ক্রিয় ও কার্যক্ষমতা হারানো দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার তানিয়া তাহের গত দুই বছর ধরে বিপুল অর্থের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়ন করে আসছেন। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজিআর) এবং জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহনপুর দলিল লেখক সমিতির বেশ কয়েকজন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে দলিল লেখার কাজে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা অযোগ্য। কেউ কেউ ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কোনো দলিল লেখেননি, কারও ডায়েরি নেই, আবার কেউ প্যারালাইসিস, অসুস্থ বা মাদকাসক্ত দলিল লেখায় অক্ষম অবস্থায় রয়েছেন। তবুও প্রতি বছর নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হচ্ছে।

নওনগর গ্রামের সোলায়মান কাজির ছেলে সাব-রেজিস্ট্রার হওয়ার পর নিজে আর দলিল লেখেন না, তবুও তার ৫৮ নম্বর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। সইপাড়া গ্রামের সাবেক সভাপতি আলহাজ মুনসুর রহমান (সনদ ২১), সাঁকোয়া গ্রামের মাহতাবুল আলম মুহুরি (সনদ ৩৫), তশোপাড়া গ্রামের আব্দুর রহমান (সনদ ১১), হাটরা গ্রামের রফিকুল আলম (সনদ ৪৬), বেলনা গ্রামের একরামুল হক (সনদ ২৯) এদের অধিকাংশই বহু বছর ধরে নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।
এছাড়াও রফিক ভাণ্ডারির ভাই ইকবাল হোসেন (সনদ ৪৫) সহ দলিল লেখক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের ৩/৫ জন নিয়মিত মাদক সেবন করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যারা মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত তাদের ডোপ টেস্ট করে সনদ বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছে।

অভিযোগকারী প্রশ্ন তুলেছেন, “যারা বছরের পর বছর একটি দলিলও লেখে না, অথচ দলিল লেখক সমিতি ও সাব-রেজিস্ট্রারের যোগসাজশে তাদের লাইসেন্স নবায়ন হয়, তারা কিসের দলিল লেখক?”

‘দলিল লেখক (সনদ) বিধিমালা, ২০১৪’-এর ৮(১) ধারায় বলা আছে— যাদের শারীরিক অক্ষমতা, নৈতিক স্খলন, মাদকাসক্তি বা পেশাগত নিষ্ক্রিয়তা রয়েছে, তাদের সনদ বাতিলযোগ্য। এছাড়া ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে, নিয়মিত কার্যক্রমহীন বা অসুস্থ দলিল লেখকের লাইসেন্স নবায়ন করা আইনত অপরাধ।

আইনজীবীরা বলেছেন, দলিল লেখক সনদ একটি সরকারি অনুমোদনপত্র। এটি নবায়নে দুর্নীতি হলে সম্পত্তি হস্তান্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। তারা বলেন, “দলিল লেখক লাইসেন্স নবায়নে দুর্নীতি বা ঘুষ গ্রহণ দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”

মোহনপুর উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আতাউর রহমান পিটার বলেন, অভিযোগের বিষয়টি সঠিক নয়। নিয়ম মেনেই সনদ নবায়ন করা হয়। তাছাড়া সাব-রেজিস্ট্রারের যেভাবে আমাদের নির্দেশনা দেন তার বাইরে আমাদের যাওয়ার কোন সুযোগ নাই।

মোহনপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার তানিয়া তাহের বলেন, “অভিযোগ কিছুটা সত্য। তবে তাদের রুটি-রুজির কারণেই লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। আমার কাছে তো কেউ মাদকাসক্ত হয়ে আসে না যে বুঝব কে মাদকাসক্ত। অভিযোগের সত্যতা খুঁজে দেখব। সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা দলিল লেখক সমিতি নিতে পারে, আমি নিই না।”

রাজশাহী জেলা রেজিস্ট্রার মো. আব্দুর রকিব সিদ্দিক বলেন, “এসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। অভিযোগ পেলে গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখব।”

অভিযোগকারীরা বলেছেন, “এই অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক নয়, আইনি অপরাধও বটে। তাই বিষয়টি নিবন্ধন অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত করে অবৈধ নবায়নে জড়িত সাব-রেজিস্ট্রার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”