ধারাবাহিক প্রতিবেদনের-১ম পর্ব
কেশরহাট রহমান ফিলিং স্টেশন স্বজন প্রীতিতে তেল হতে বঞ্চিত কৃষক-গ্রাহক
- আপডেট সময় : ০৫:০৫:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
- / ৫২৯ বার পড়া হয়েছে
রাজশাহী ব্যুরো: আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার অভিযোগ যখন জোরালো, তখন রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাটে অবস্থিত রহমান ফিলিং স্টেশনকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম, সিন্ডিকেট ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ।
এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহক ও কৃষকরা, আর তেলের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে কালোবাজারে—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে।
সরকার তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং মজুতদারি ঠেকাতে প্রতিটি পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ কঠোর মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৩১ মার্চ রাত থেকেই রহমান ফিলিং স্টেশনের সামনে শত শত মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। সকাল গড়াতেই তা হাজার ছাড়িয়ে যায়।

ট্যাগ অফিসার ও পুলিশ তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পড়েছেন বাধার মুখে। ফলে সেখানে তৈরী হয়েছে জটিলতা।
অভিযোগ রয়েছে, পাম্প মালিক মিজানুর রহমান (মিজান) তার পছন্দের লোকজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে তেল সরবরাহ করছেন। লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সাধারণ গ্রাহকরা তেল পাচ্ছেন না। এমনকি দুপুরের পর মজুদ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অপেক্ষমাণ গ্রাহকরা। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, “রাত থেকে লাইনে আছি, কিন্তু বিকেল হয়ে গেলেও তেল পাইনি। অথচ লাইনের বাইরে থেকে পরিচিতদের গাড়ির ট্যাংক ভরে পেট্রোল দেওয়া হচ্ছে।”
প্রতিবাদ জানালে পাম্প মালিকের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে গ্রাহকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেল, পেট্রোল না পেয়ে অনেক জমি শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে। কৃষক আল আমিন বলেন, “দশ দিন ধরে তেলের জন্য ঘুরছি, আজও পেলাম না।পানি সেচের অভাবে জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, রহমান পাম্প থেকে রাতের আঁধারে অবৈধ পুকুর খনন ও কালোবাজারে বিক্রির জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেল পাচার হয়ে যাচ্ছে বাগমারা, তানোর ও মান্দা এলাকায়। ফলে পাম্পে তেলের সংকট দেখা দিলেও বাইরে কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
বর্তমানে যেখানে ডিজেলের সরকারি দাম ১০০ টাকা, সেখানে কালোবাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। আর ১১৬ টাকার পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায়।
৩১ মার্চ ত্রিমোহনী বাজারে কাগজপত্রবিহীন প্রায় ২০০ লিটার ডিজেলসহ এক অটোচালককে আটক করে জনতা। পরে উপজেলা প্রশাসন সেই তেল জব্দ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিক্রি করে—যা তেল পাচারের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
সরকারি নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এমন অনিয়ম কীভাবে চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। ট্যাগ অফিসার ও পুলিশের উপস্থিতিতেও অনিয়ম বন্ধ না হওয়ায় প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

এবিষয়ে পাম্প মালিক মিজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, অপরদিকে কাছাকাছি আরেকটি পাম্প কেশরহাট ফিলিং স্টেশনে তেল বিতরণে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। এই পাম্পে সকাল থেকে তেল শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কেশরহাট ফিলিং স্টেশনের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বলেন, “চাহিদার তুলনায় তেলের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা গ্রাহকদের মাঝে সাধ্য অনুযায়ী তেল বিতরণের চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
এদিকে তেলের সংকটে পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। ডিজেলচালিত সিএনজি চালকরা বেশি দামে তেল কিনতে বাধ্য হওয়ায় যাত্রীপ্রতি অতিরিক্ত ১০-২০ টাকা ভাড়া নিচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষকেই গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ।
সচেতন নাগরিকদের মতে, অবৈধ মোটরসাইকেলে তেল বিক্রি বন্ধ, ট্রাফিক পুলিশের সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং পাম্পগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ালে সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
দেশে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও যদি একটি চক্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তবে তা শুধু গ্রাহক নয়—সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও বড় হুমকি।
এব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচেতন নাগরিক জানান তিনি শীঘ্রই জনস্বার্থে মেসার্স রহমান ফিলিং স্টেশনের মালিক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকারসহ আদালতে মামলা দায়ের করবেন।
ফলে মেসার্স রহমান ফিলিং স্টেশনের তেল বরাদ্দ বন্ধ করে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
আগামী ২ পর্বে থাকছে আরো বিস্তারিত









