বাঘা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনিয়মের মহোৎসব: কাগজে কাগজে রোগী, বিলের পাহাড়
- আপডেট সময় : ০৫:০৭:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৫২৯ বার পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহীর বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন পরিণত হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক কেন্দ্রস্থলে। অভিযোগের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য ও দায়িত্বে অবহেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব পালনের চেয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে অপারেশন করাই ডা. আসাদের প্রধান মনোযোগ। কর্মঘণ্টায় হাসপাতালের পরিবর্তে বাইরের ক্লিনিকে অবস্থান করা তাঁর নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন, আর প্রতিবাদ করলেই নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের রোগীদের খাবার (ডায়েট) বরাদ্দে চলছে সংঘবদ্ধ জালিয়াতি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি অর্থ আত্মসাতের জন্য সাদা কাগজে ভুয়া রোগীর নাম লিখে বিল তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি পুরুষ ওয়ার্ডে মাত্র একজন রোগী ভর্তি থাকলেও নথিপত্রে ২০ জনের খাবারের বিল উত্তোলনের মতো চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ধরা পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিদিনের ভর্তি ও ডিসচার্জ রেজিস্টার এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ মিলিয়ে দেখলেই এই তথাকথিত ‘ভূতুড়ে রোগী’র রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে।
ডা. আসাদের দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না হাসপাতালের কর্মচারীরাও। একাধিক নারী কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুর করতে ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ছুটি আটকে রেখে মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভুক্তভোগীরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
হাসপাতাল চত্বরজুড়ে দালাল চক্রের অবাধ বিচরণে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও স্বজনরা প্রতিনিয়ত দালালদের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, এই দালাল চক্রের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরোক্ষ যোগসাজশ রয়েছে।
ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা ও উপহার নেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ প্রেসক্রাইব করার অভিযোগও রয়েছে। এতে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের সিসি ক্যামেরা, ভর্তি-ডিসচার্জ রেজিস্টার, ডায়েট বিলের ভাউচার ও অন্যান্য নথি যাচাই করলে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া সম্ভব। তাঁদের মতে, এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বাঘা উপজেলার সচেতন নাগরিকরা এই ‘দুর্নীতির সিন্ডিকেট’ ভাঙতে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, তদন্ত ছাড়া বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ডা. আসাদুজ্জামান আসাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম বলেন,
“অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”













